সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের আটঘর গ্রমে ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহবুব খানের গাড়ি কেনা ও অর্থ লেনদেন নিয়ে বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মারধর, বাড়ির গেটের নামফলক ভাঙচুর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন আবুল কালাম। পাশাপাশি গাড়ি কেনা ও ভাড়া-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে আদালতে সিআর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে আটঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আতাউর রহমান খানকে ঘিরে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মামলার কাগজপত্র ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, গাড়ি কেনার জন্য ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহবুব খানের অর্থ পাঠানো, গাড়ির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং গাড়িভাড়া পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে। মাহবুব খানের দাবি, তাঁর প্রায় ২১ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি আত্মসাৎ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে গাড়ির মালিকানা ও অর্থ লেনদেন নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচার ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে
আদালতে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, সিআর মোকদ্দমা নম্বর ১৯৫/২০২৬-এর বাদী মো. আবুল কালাম (৩৮)। তিনি জগন্নাথপুর উপজেলার মীরপুর ইউনিয়নের আটঘর (আমড়াতৈল) গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহবুব খানের বসতবাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের জন্য মাহবুব খান তাঁকে মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতন দিতেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে মাহবুব খানের অর্থে একটি গাড়ি কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়। গাড়িটি ব্যবহারের বিনিময়ে প্রতিদিন দুই হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার মৌখিক চুক্তি হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাহবুব খানের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-২৩-৮১৩৬। এটি সাদা রঙের টয়োটা এক্সিও মডেলের গাড়ি। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর, ৫ নভেম্বর, ১২ নভেম্বর ও ২ ডিসেম্বরসহ বিভিন্ন তারিখে তিনি ইংল্যান্ড থেকে গাড়ি কেনার জন্য অর্থ পাঠান বলে দাবি করেন।
মাহবুব খানের অভিযোগ, তাঁর পাঠানো অর্থে গাড়িটি কেনা হলেও তাঁর নামে নিবন্ধন না করে কাউছার আহমদ খানের নামে নিবন্ধন করা হয়। এতে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, গাড়িটির মূল্য প্রায় ২১ লাখ টাকা এবং দীর্ঘদিন ধরে সেটি তাঁকে বুঝিয়ে না দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গাড়িভাড়া পরিশোধ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আবুল কালাম ভাড়া চাইতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে গাড়িটি নিজের বলে দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ১৫ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে আটঘর এলাকায় গাড়িভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে আবুল কালামকে মারধরের অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় আতাউর রহমান খান, কাউছার আহমদ খান, আজিজুর রহমান খান ও দিলদার হোসেনের নাম মামলা করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, তাঁকে কিল-ঘুষি ও লাথি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফোলা জখম করা হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাঁকে উদ্ধার করেন। স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনায় দায়ের করা সিআর মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৫০৬(২) ও ৩৪ ধারার উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার সর্বশেষ আদেশ এবং তদন্তের চূড়ান্ত সুপারিশ সম্পর্কে পাওয়া নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, গত ৮ মে ২০২৬ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহবুব খানের বসতবাড়িতে আরেকটি ঘটনার অভিযোগ করেন আবুল কালাম।
জগন্নাথপুর থানার লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, কয়েকজন ব্যক্তি হাতুড়ি, শাবলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম দিয়ে বাড়ির গেটের পাকা নামফলক ভাঙচুর করেন। বাধা দিতে গেলে তাঁকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগপত্রে নামফলক ভাঙচুরের কারণে আনুমানিক ৫০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার চাইতে গেলে কিংবা আইনের আশ্রয় নিলে প্রাণে হত্যা ও লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আবুল কালাম।
ইংল্যান্ড প্রবাসী মাহবুব খানের নাম ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা-সংবলিত পোস্টার লাগানোর অভিযোগও উঠেছে।
এবিষয়ে মাহবুব খান জানান, তিনি এ ধরনের কোনো পুরস্কার ঘোষণা করেননি। তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এসব পোস্টার লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখতে মামলা করা হয়েছে এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করার প্রত্যাশা করছেন তিনি। তবে পোস্টার লাগানোর সাথে কারা জড়িত, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গাড়ি ও অর্থ লেনদেনের বিরোধের পাশাপাশি আটঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানান, আতাউর রহমান খান এর আগেও বিদ্যালয়টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আগের দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত সভায় উপস্থিত না থেকেও পরবর্তী সময়ে রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মোমাদ খানকে বিদ্যুৎসাহী সদস্য করা হলেও তাঁর কোনো সন্তান বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত নয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাহান খানকে জমিদাতা সদস্য করা হলেও তিনি কিংবা তাঁর পূর্বপুরুষেরা বিদ্যালয়ে জমি দান করেননি বলে স্থানীয়রা জানান।
আটঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তাহমিনা বলেন, যেদিন কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম না। আমি অসুস্থ ছিলাম। যতটুকু শুনেছি, অভিভাবকদের সম্মতিতে তিনি সভাপতি হয়েছেন। রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর করতেন বলে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান আমি নতুন জয়েন্ট করেছি এর আগে কি হয়েছিলো আমার জানা নেই।
প্রধান শিক্ষিকার বক্তব্য অনুযায়ী, কমিটি গঠনের সময় তিনি উপস্থিত না থাকায় প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে তাঁর জানা তথ্য সীমিত।
জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন বলেন,এ বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে। আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করে আরেকটি অভিযোগ এসেছে। সেটির তদন্ত চলছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
গাড়ি কেনা ও অর্থ লেনদেনের বিরোধ, মারধর, বাড়ির নামফলক ভাঙচুর, প্রাণনাশের হুমকি এবং বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা আরোও জানান , গাড়ির প্রকৃত মালিকানা, অর্থ পাঠানোর প্রমাণ, গাড়ি ব্যবহারের শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র যাচাই করে বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। একই সাথে বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য মনোনয়ন ও সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াও বিধি অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা যাচাই করা দরকার।
আতাউর রহমান এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, তার ও তাঁর দুই ছাত্রকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে হয়রানির শিকার করা হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁর ভাই মাহবুব খান ১০ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুব খান বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে আতাউর রহমান ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী জড়িত। তাঁর দাবি, তাঁকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তাঁরা পরিকল্পিতভাবে এ নাটক সাজিয়েছেন।
তবে অভিযোগে নাম আসা অনেকের বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালত ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।