বর্তমানে অনিয়মিত জীবনযাত্রা, পরিবেশগত দূষণ ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে মানুষের নানা জটিল রোগব্যাধি বেড়ে চলেছে। তবে সঠিক স্বাস্থ্যভ্যাস, রোগপ্রতিরোধক টিকাদান এবং চিকিৎসা সেবায় সামান্য সচেতনতাই পারে আমাদের অনেক বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে।
১. সুস্বাস্থ্য রক্ষায় দৈনন্দিন করণীয়:
রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে রোগ যেন না হয় তার ব্যবস্থা নেওয়া (Preventive Healthcare) শ্রেয়। এজন্য প্রতিদিনের জীবনে কিছু মৌলিক নিয়ম মেনে চলা দরকার:
সুষম ও পৌষ্টিক খাবার গ্রহণ: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত সবুজ শাকসবজি, টাটকা ফলমূল, প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম, ডাল) এবং বিশুদ্ধ পানি রাখুন। ফাস্টফুড, প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত তেল-মসলা এবং চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলুন।
পর্যাপ্ত পানি ও ঘুম: শরীর হাইড্রেটেড রাখতে ও সার্বিক কার্যক্রম সচল রাখতে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। এছাড়া শরীর ও মন সতেজ রাখতে প্রতি রাতে ৭-৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি।
শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম: অলস জীবনযাপন এড়িয়ে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। এটি হৃদযন্ত্র ভালো রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক প্রশান্তি ও স্ক্রিন টাইম কমানো: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ এড়াতে শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের ব্যবস্থা করুন। রাতে ঘুমানোর আগে মোবাইল ও ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহার বন্ধ রেখে মানসিকভাবে শান্ত থাকুন।
২. প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা (রুটিন টেস্ট):
যে কোনো রোগের লক্ষণ প্রকট হওয়ার আগেই নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে তা ধরা সম্ভব। বয়স ও শারীরিক অবস্থা ভেদে বছরে অন্তত একবার নিচের সাধারণ টেস্টগুলো করা উচিত:
রক্তের শর্করা (Diabetes Test): Fasting Blood Sugar ও HbA1c।
রক্তের সার্বিক অবস্থা: Complete Blood Count (CBC)।
লিপিড প্রোফাইল (Lipid Profile): রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ফ্যাটের মাত্রা পরীক্ষা।
লিভার ও কিডনি কার্যাবলী: Serum Creatinine, SGPT/SGOT।
নিয়মিত প্রেসার মাপা: রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা তা সময়ে সময়ে মাপা।
৩. সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিতে ভ্যাক্সিন বা টিকা (এ টু জেড):
বিভিন্ন মরণব্যাধি ও ছোঁয়াচে রোগ থেকে জীবন রক্ষা করতে টিকার কোনো বিকল্প নেই। শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—সবার জন্যই নির্দিষ্ট কিছু টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:
শিশুদের ইপিআই (EPI) শিডিউল: শিশুদের জন্মের পর থেকেই যক্ষ্মা (BCG), পোলিও (OPV/IPV), ডিপথেরিয়া, হুপ কাশি, টিটানাস, হেপাটাইটিস বি, হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি (Pentavalent Vaccine), নিউমোনিয়া (PCV), ডায়রিয়া (Rotavirus Vaccine) এবং হাম-রুবেলা-মাম্পসের (MR/MMR) টিকাগুলো নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করতে হবে।
টিটানাস/ধনুষ্টংকার (TT): যে কোনো সময় কাটা-ছেড়া থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে এবং নারীদের গর্ভকালীন সময়ে সুরক্ষার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে টিটানাসের ডোজ বা প্রতি ১০ বছর পর পর বুস্টার নেওয়া উচিত।
হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B): মরণব্যাধি লিভার সিরোসিস ও ক্যানসার এড়াতে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যান্টিবডি না থাকলে ৩টি ডোজের এই কোর্স পূর্ণ করা উচিত।
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু ভ্যাকসিন: সাধারণ সর্দি-কাশি ও ফ্লুর হাত থেকে সুরক্ষায় প্রতি বছর শীতের আগে এই টিকা নেওয়া যায়।
নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিন: ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে এবং জটিল রোগীদের নিউমোনিয়া প্রতিরোধে এটি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এইচপিভি (HPV) ভ্যাকসিন: জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য কিশোরী ও নারীদের নির্দিষ্ট বয়সে এই ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।
৪. চিকিৎসা গ্রহণ, ডায়াগনস্টিক ও সিরিঞ্জ ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা:
চিকিৎসা সেবা নেওয়ার সময়ে সামান্য ভুলত্রুটিও অনেক বড় বিপদের কারণ হতে পারে। এজন্য হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে খেয়াল রাখা উচিত:
মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান নির্বাচন: রক্ত পরীক্ষা বা যে কোনো ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার সঠিক ফলাফলের জন্য সরকারি অনুমোদিত এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিসম্পন্ন বিশ্বস্ত হাসপাতাল বা ল্যাব বেছে নিন।
ইনজেকশন ও সিরিঞ্জ ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা: রক্ত সংগ্রহ বা ইনজেকশন দেওয়ার সময়ে নিশ্চিত হয়ে নিন যেন স্বাস্থ্যকর্মী আপনার সামনেই একেবারে নতুন ও সিল করা প্যাকেট থেকে ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ বের করছেন। কোনো অবস্থায় প্যাকেট খোলা বা পুরনো সিরিঞ্জ ব্যবহার করতে দেবেন না। ব্যবহার শেষে সূঁচ ও সিরিঞ্জটি যেন নষ্ট/ধ্বংস করা হয় তাও খেয়াল রাখুন।
একটি সুস্থ, রোগমুক্ত ও সচেতন সমাজ গড়তে হলে নিজে এসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি পরিবারের অন্য সদস্য ও পরিচিতদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সচেতনতাই প্রতিরোধ ও সুস্থতার সবচেয়ে বড় উপায়।